পর্ষদের নির্দেশের জেরে বন্ধ হতে বসেছে এবিটিএ’র টেস্ট পেপার, ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা

অর্পণ সেনগুপ্ত, কলকাতা: মধ্যশিক্ষা পর্ষদের নির্দেশের জেরে সম্ভবত একটি যুগের অবসান হতে চলেছে। এখনও পর্যন্ত যা খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এবার শিক্ষক সংগঠন এবিটিএ তাদের টেস্ট পেপার বের করছে না। পরিবর্তে তারা ‘মডেল কোশ্চেন বাঞ্চ’-এর মতো কিছু একটা বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সেটা চরিত্রগতভাবে টেস্ট পেপারের মতো না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। তবে, এবিটিএ এখনই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে নারাজ। সরাসরি কেউ স্বীকারও করছেন না। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্যকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা ছাত্রছাত্রীদের প্রতি দায়বদ্ধ। তাদের স্বার্থে যা করা প্রয়োজন, সেটাই করব।
সবচেয়ে পুরনো টেস্ট পেপারগুলির মধ্যে এবিটিএ অন্যতম। এর পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক সমিতি এবং মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির টেস্ট পেপারও ছিল। কিন্তু জনপ্রিয়তায় বাকিদের কিছুটা পিছনেই ফেলে দিত এবিটিএ বা নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির টেস্ট পেপার। বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর স্বাভাবিকভাবেই একচেটিয়া বাজার ধরে ফেলে সিপিএমের শিক্ষক সংগঠনের টেস্ট পেপারটি। নামী শিক্ষকরা সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকায় এর মানও হত খুবই ভালো। অনেক পরে, হাল আমলে বেশ কিছু বাণিজ্যিক সংস্থা টেস্ট পেপার বাজারে আনলেও দাম এবং মানের প্রতিযোগিতায় এবিটিএকে পিছনে ফেলতে পারেনি। কিন্তু, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলি যা পারেনি, সেটাই করে দেখিয়েছে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ।
পর্ষদের তরফে সমস্ত স্কুলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এবারের টেস্টের প্রশ্ন তাদের শিক্ষকদেরই করতে হবে। অর্থাৎ, কোনও স্কুলের টেস্টের প্রশ্নপত্র তৈরি করবেন সেই স্কুলেরই শিক্ষকরা। আর সমস্ত প্রশ্নপত্র ইমেলের মাধ্যমে পাঠাতে হবে মধ্যশিক্ষা পর্ষদকে। সেখান থেকে বাছাই করা প্রশ্ন নিয়ে নিজেদের টেস্ট পেপার তৈরি করবে পর্ষদ। বেশ কিছু ভুইফোঁড় সংস্থা কয়েক বছর ধরেই টেস্টের প্রশ্নপত্র বিক্রি করা শুরু করেছিল। সেই সংস্থাগুলির না ছিল কোনও রেজিস্ট্রেশন, না কোনও অফিস না প্রশ্নপত্র বিক্রির কোনও ট্রেড লাইসেন্স। এমনকী, পর্ষদ বা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদও গোটা বিষয়টি নিয়ে অন্ধকারে ছিল। এর বিরুদ্ধে প্রথম শিক্ষাদপ্তরে অভিযোগ জানায় পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক ও শিক্ষা বিষয়ক কর্মচারী ফেডারেশন। তা নিয়ে প্রশাসন বেশ নড়েচড়ে বসে। এটা নিয়ে লেগে ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চক্রবর্তী। শেষে, এ বছর বাইরে থেকে কোনও প্রশ্নপত্র নেওয়াই নিষিদ্ধ করে দিয়েছে পর্ষদ।
এই অর্ডারের জেরে বেশ কিছু সন্দেহজনক সংস্থার ব্যবসা যেমন বন্ধ হয়েছে, তেমনই বিপাকে পড়েছে বহুদিনের পুরনো শিক্ষক সংগঠনগুলি। তারা নিয়মনীতি মেনেই টেস্টের প্রশ্নপত্র এবং টেস্ট পেপার বিক্রি করত। কিন্তু পর্ষদের নির্দেশে তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংগঠনগুলির আয়ের একটা বড় উৎসই বন্ধ হয়ে গেল। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পর্ষদের সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে গিয়েছিলেন মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি, প্রধান শিক্ষক সমিতি এবং পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকরা। কিন্তু তাতে লাভ কিছুই হয়নি। মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ মিত্র বলেন, আমরা ১৯ সেপ্টেম্বর এর বিরুদ্ধে অবস্থান আন্দোলন শুরু করছি। রাজ্য সরকার পর্ষদের মাধ্যমে টেস্ট পেপার বিনামূল্যে বিলি করছে। এটাকে স্বাগত জানিয়ে আমাদের টেস্ট পেপার বিক্রি আমরা কয়েক বছর আগেই বন্ধ করে দিই। কিন্তু টেস্টের প্রশ্নপত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবসম্মত নয়। এতে ছাত্রছাত্রীরা বাইরের প্রশ্নের সঙ্গে পরিচিত হতে পারত। এছাড়া, স্কুলের শিক্ষকরা প্রশ্নপত্র তৈরি করলে অনেক সময়ই স্বজনপোষণের অভিযোগ উঠতে পারে। তাছাড়া, আর্থিকভাবেও সংগঠনগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিক্ষক সংগঠন বিটিইএ-র সহ-সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলও পর্ষদের এই নির্দেশের তীব্র নিন্দা করেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com